চীন-পাকিস্তান তথ্য করিডর নিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন শঙ্কা

ভুয়া খবর ও অপতথ্য প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে যৌথভাবে 'চীন-পাকিস্তান তথ্য করিডর' (সিপিআইসি) চালু করেছে চীন ও পাকিস্তান। তবে এই উদ্যোগের আড়ালে দুই দেশের সরকার সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নিজেদের স্বার্থবিরোধী সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে বলে আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা।
বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে 'বিভ্রান্তিকর' আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকদের চাপে রাখার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এই উদ্যোগ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে পিছিয়ে থাকা দুই দেশের এমন যৌথ উদ্যোগ নতুন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর ইসলামাবাদের পাকিস্তান-চীন ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে সিপিআইসি চালু করা হয়। পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এবং পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জিয়াং জাইদং।
অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার প্রকল্পটিতে সহযোগিতার জন্য চীনা দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান।
সিপিআইসির আওতায় দুই দেশের ১৮টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সংবাদ ও কনটেন্ট বিনিময় করবে। পাশাপাশি যৌথভাবে সংবাদ তৈরি এবং দুই দেশের সরকারের বিবেচনায় বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদনগুলোর জবাব দিতে একটি ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট গঠন করা হবে। এ ছাড়া দুই দেশের থিংকট্যাংকগুলো যৌথ গবেষণা ও প্রকাশনার কাজ করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) 'কণ্ঠস্বর' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কয়েক বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ ও অর্থায়নে পরিচালিত সিপিইসি পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রকল্প।
তবে সিপিআইসির ধারণা নতুন নয়। ২০২৪ সালের মার্চে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সিপিইসি নিয়ে কথিত ভুয়া খবরের বিরুদ্ধে চীন ও পাকিস্তানকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর আগে ২০২১ সালে চীন-পাকিস্তান মিডিয়া ফোরাম একটি মিডিয়া করিডর গঠনের ঘোষণা দিয়ে এ বিষয়ে নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যৌথভাবে পরিচালিত একটি 'নার্ভ সেন্টার' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাকিস্তানের তথ্যপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ ও প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে চীন উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
সিপিআইসির সঙ্গে যুক্ত ১৮টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল। চীনের পক্ষ থেকে রয়েছে সিনহুয়া, চায়না মিডিয়া গ্রুপ ও পিপলস ডেইলি। অন্যদিকে, পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউট দুই দেশের থিংকট্যাংকগুলোর যৌথ গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, এসব কার্যক্রম দুই দেশের পক্ষে জনমত ও বয়ান তৈরিতে সহায়তা করবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিংয়ের ভাষ্য, দুই দেশই অপতথ্য, ভুয়া খবর ও মিথ্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব মোকাবিলা করে দুই দেশের অনুকূলে জনমত তৈরিতে এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, কোন সংবাদকে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর বলা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে কে? বিশেষ করে দুই দেশের সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ কতটা নিরপেক্ষ থাকবে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
পাকিস্তানে ভুয়া খবর ছড়ানোর অভিযোগে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশটির সরকার ইলেকট্রনিক অপরাধ প্রতিরোধ আইন (পেকা) সংশোধন করে।
সংশোধিত আইনের ২৬-এ ধারায় জেনেশুনে বা যুক্তিসংগতভাবে মিথ্যা বলে বিশ্বাস করা হয়—এমন তথ্য ছড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ পাকিস্তানি রুপি জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট তথ্যের কারণে জনমনে ভয়, আতঙ্ক বা অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকতে হবে।
এ ছাড়া সংশোধিত আইনে সরকারনিয়ন্ত্রিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় 'পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী' হিসেবে বিবেচিত কনটেন্টও অপসারণের সুযোগ রয়েছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, আইন সংশোধনের পর প্রথম নয় মাসে পেকা আইনে অন্তত নয়জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের মার্চে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন রাফতার প্রতিষ্ঠাতা ফারহান মালিক।
এ ছাড়া ডন-এর সাংবাদিক মুহাম্মদ আকবর নোটজাইকে নোটিশ পাঠায় পাকিস্তানের ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনসিসিআইএ)। বেলুচিস্তানে দুর্নীতি নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ নোটিশ দেওয়া হয়। বেলুচিস্তানেই অবস্থিত সিপিইসির গুরুত্বপূর্ণ গোয়াদর বন্দর।
২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ পাকিস্তান সরকার পেকা আইনের ২৬-এ ধারায় ১৮৭টি মামলা দায়েরের তথ্য জানিয়েছিল। অন্যদিকে, ফ্রিডম নেটওয়ার্ক ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১২৯টি অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ৫৮টি ছিল আইনি মামলা, যার অধিকাংশই পেকা আইনের আওতায়।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইকবাল খট্টক বলেছেন, সংশোধিত আইন সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে। মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেক সাংবাদিক নিজেদের সংযত করছেন।



